ভূমি অধিগ্রহণ এবং উন্নয়নের সম্পর্ক মূল্যায়ন কর

ভূমি অধিগ্রহণ এবং উন্নয়নের সম্পর্ক মূল্যায়ন আলোচনা

ভূমিকা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যখন কোনো শক্তি বা জনগোষ্ঠীকে তাদের মূল বাসভূমি থেকে জোর করে সরিয়ে দিয়ে অন্যত্র বসতি স্থাপনে বাধ্য করা হয় তখন তাকে উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন তত্ত্ব পুনঃস্থাপন বলা হয়। একে সংক্ষেপে উন্নয়ন বিতাড়নও বলা হয়। Anthony Oliver Smith (২০০৯) সালে সচেতনতায় দেখান, প্রতি বছর বর্তমানে ১৫ মিলিয়ন মানুষ বিভিন্নভাবে এই পুনঃস্থাপনের শিকার হয়।

ভূমি অধিগ্রহণ এবং উন্নয়নের সম্পর্ক

ভূমি অধিগ্রহণের সাথে উন্নয়নের সম্পর্ক

নিম্নে ভূমি অধিগ্রহণের সাথে উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কারণ আলোচনা করা হলো-

১. বাধ, জল বিদ্যুৎ, জলসেচ এবং কৃত্রিম জলসঞ্চলন উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন:

সরকারের বাঁধ, জল বিদ্যুৎ, জলসেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রচুর মানুষের এবং পশুপাখির আবাস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন' প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং সবচেয়ে বেশি প্রলয়ংকরী ভূমিকা রাখে এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। এসব কাজ করতে গেলে হঠাৎ বিশাল এলাকায় বন্যা হয়। যে বন্যায় বিস্তীর্ণ ভূমি তলিয়ে যেতে পারে। কোনোভাবে আগের থেকে আন্দাজ করা যায় না কতটুকু ভূমি জুড়ে বন্যা হবে। ফলে আগে থেকে কোনো সাবধানতা অবলম্বন করা সম্ভব হয় না। আবার বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের অন্য কত অর্থ বা কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে আগে থেকে ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ করা যায় না বলে সেই ব্যাপারেও কোনো প্রকার অগ্রিম বরাদ্দ বা অগ্রিম কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় বন্যার পরবর্তী পুনর্বাসনও ঠিকমতো হয় না। বিশাল বন্যার জন্য এলাকাবাসী আগে থেকে প্রস্তুতিও রাখতে পারে না। ফলে ক্ষতিয় পরিমাণ ক্রমশ আরও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্প এরকম একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যা একসাথে লক্ষাধিক মানুষকে গৃহহীন করেছিল। যার পুনর্বাসন এখনও সরকার করে উঠতে পারেনি।

২. যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন:

উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশসমূহের জনসংখ্যার ঘনবসতির জন্য মূলত অবকাঠামো বিষয়ক উন্নয়ন এখানে জনসাধারণের মাধ্যে 'উন্নয়ন তাড়নে বিতাড়ন প্রক্রিয়া ঘটায়। World Bank-এর হিসেবে প্রতি বছর পৃথিবীতে যে পরিমাণ মানুষ গৃহহীন হয় তার ২৬.৪% হলো অবকাঠামো উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন।

উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতা ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় প্রচুর মানুষের আবাস এবং এসব বস্তি এলাকাগুলোর বেশিরভাগই সরকারি খাস জমিতে স্থাপিত হয়। সরকার এই খাস জমিতে যখন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে হাত দেয় তখন প্রচুর পরিমাণে মানুষ গৃহহীন হয়। যেহেতু বেশিরভাগ সময়ে সরকারি হিসেবে বস্তি আবাসনের অধিবাসীদের সঠিক সংখ্যা লিপিবদ্ধ থাকে না বেশিরভাগ সময়ে তাই কত মানুষ এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা আন্দাজ করা আগের থেকে সম্ভব হয় না। দুই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ "অবকাঠামো উন্নয়ন তাড়িত বিতাড়ন করে, এগুলো হলো- রাস্তাঘাট উন্নয়ন, বিমানবন্দর, নদী বন্দরস্থাপন।

অধিকাংশ দরিদ্র দেশে রাস্তার পাশে দরিদ্র আবাস গড়ে ওঠে। জনসংখ্যার চাপে রাস্তা প্রসারিত করতে হলে এসব মানুষকে বিতাড়ন করতে হয়। আবার দেশের নদী তীরবর্তী বা হঠাৎ জেগে ওঠা চর এলাকার খাসভূমিতে দরিদ্র মানুষ আবাস তৈরি করে। এসব স্থানে নদীবন্দর বা এয়ারপোর্ট নির্মিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তখন এখানে আবার উন্নয়ন বিতাড়ন ঘটতে থাকে।

৩. নগরায়ণ, পুনঃনগরায়ণ এবং জনসংখ্যা পুনর্বাসন তাড়িত উন্নয়ন:

নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নগরের। আকার বাড়তে থাকে এবং নগরের বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গৃহীত হতে থাকে, যেমন- পানি সরবরাহ প্রকল্প, বিদ্যুতায়ন প্রকল্প।

এসব প্রকল্প করবার জন্য স্থান নির্বাচন, কার্যালয় স্থাপন ইত্যাদি করার সময় এক ধরনের 'উন্নয়ন বিতাড়ন' প্রক্রিয়া হলে। কিন্তু নগরায়ণ ঘটানোর জন্য যে "উন্নয়ন বিতাড়ন হয় তা সাময়িক কারণ। এই বিতাড়িত জনগোষ্ঠী আবার নগরায়ণসম্পন্ন হলে সেই নগরেই অবস্থান করতে থাকেন।

নগরের পাশে বিভিন্ন এলাকার যখন গ্রাম্য জনবসতি সাফ করে সেখানে নগরায়ণ করা হয় এবং সেখানে নতুন করে নগরের বসতি এবং অন্যান্য আবাসন তৈরি করা হয় এভাবে যে উন্নয়ন করা হয় তাকে পুনঃনগরায়ণ বলা হয়। অর্থাৎ পুরনো নগরের বিভিন্ন অসুবিধার জন্য তা পরিষ্কার করে নতুন নগর তৈরি করা হয়। এই পুনঃনগরায়ণ প্রক্রিয়ায় প্রচুর "উন্নয়ন বিতাড়ন ঘটে এবং মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এ ধরনের উন্নয়ন বিতাড়নের উদাহরণ দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ: যেমন ডোমিনাকা এবং ব্রাজিলে পাওয়া গেছে।

৪. বন বিধাংসীকরণ এবং কৃষি সম্প্রসারণ:

সাধারণত দেশের বনভূমির জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা যেখানে জনসংখ্যা কম সেখানে বিভিন্ন ধরনের কৃষি সম্প্রসারণ এবং বন বিধ্বংসীকরণ প্রকল্পগুলো গৃহীত হয়। ব্যাপক এলাকার বনভূমি ধ্বংস করে এখানে সাধারণত বিভিন্ন পরীক্ষামূলক ফসলের এক ফসলি চাষ করা হয়। এর ফলে ঐ এলাকায় বসবাসরত বিভিন্ন ধরনের উপজাতি এবং আদিম সম্প্রদায়সমূহ তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক জীবিকা হারিয়ে ফেলে। বেশিরভাগ সময়ে এ ধরনের প্রকল্পে বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের চাষ করা হয়, ফলে এলাকায় খাদ্যপণ্যের সংকট দেখা দেয় এবং জীবন বাঁচাতে অনেক মানুষ আবাস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। অনেক সময়ে এসব মানুষকে নতুন কৃষি কর্মকান্ডে যুক্ত করা হয় এবং এরা কম মূল্যের কৃষি শ্রমিকে পরিণত হয়। এই প্রকার প্রকল্পসমূহ জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘকালের জন্য ঐ ভূমিকে আবাস অনুপোযোগী করে দেয়।

৫. খনিকার্য ও সম্পদ পরিবহণ:

খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ, শ্রমিক আবাসন ও পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে আশপাশের এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন হয়। তেল ও কয়লার মতো খনিজ উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়, যা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। এর ফলে বহু মানুষ পরিবেশগত কারণে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং পরিবেশ শরণার্থীতে পরিণত হয়।

৬. জনসমষ্টি পুনর্বণ্টন:

প্রকল্প রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে যখন কোনো এলাকার জনগণকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরিয়ে দেয়া হয় তখন এই প্রকার উন্নয়ন বিতাড়ন প্রক্রিয়াটি হয়। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কারণে উন্নয়ন বিতাড়ন ঘটেছে। যেমন-

উপনিবেশিত সরকার নিজস্ব উপনিবেশিক অনৈতিক শাসনের ভিত্তি জোরালো করতে ব্যাপকভাবে উন্নয়ন বিতাড়ন উপনিবেশিকরা বিতাড়ন করেছে। করেছে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী য়েড ইন্ডিয়ানদের

বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এ ধরণের উন্নয়ন বিতাড়ন করেছে। যেখন-ইসরায়েলিদের আবাস দেয়ার জন্য ব্যাপক হায়ে ফিলিস্তিনিদের ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক শক্তি উন্নয়ন বিতাড়ন করেছে।

সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ তাদের সমন্বিত গ্রাম তৈরি প্রকল্পের নামে প্রচুর পরিমাণে উন্নয়ন বিতাড়ন করেছিলেন।

ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ উৎখাত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সরকার এ ধরনের উন্নয়ন বিতাড়ন করতে পারেন। যেমন-আফ্রিকার বান্টু সম্প্রদায়কে উচ্ছেন করা এবং তাদের বসতি নষ্ট করার সরকারি প্রকল্প বা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বিতাড়নের সরকারি প্রকল্প এর উদাহরণ।

বেশিরভাগ সময়ে এই বিতাড়নপ্রক্রিয়াকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বা সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পের নাম দিয়ে এই প্রকার বিতাড়নের পক্ষে একধরনের জনমত সৃষ্টির কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা চলমান থাকে বিতাড়নপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি।

৭. পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ:

এক্ষেত্রে সাধারণত ইকোপার্ক, পশুদের অভয়ারণ্য ইত্যাদি তৈরি করে প্রকৃতি রক্ষার জন্য বিশাল এলাকা থেকে সবধরনের মানববসতি সরিয়ে দিয়ে একধরনের বিতাড়ন করা হয়। মনে করে নেয়া হয় যে, মানুষ পরিবেশের গাছপালা এবং অন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতি করবে তাই' মানুষদের তাড়িয়ে দিয়ে বন এবং বন্যপশু সংরক্ষণের কৃত্রিম একটি প্রচেষ্টা করা হয়। এই সরিয়ে দেয়া মানুষরা তাদের জীবন-জীবিকা এবং খাদ্য সংস্থানের জন্য পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আসতে ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে সম্পূর্ণ বেকারত্বে নিপতিত হয়। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় বসবাস করতে থাকেন। আবার অতিমাত্রায় প্রকৃতিনির্ভরতার থেকে হঠাৎ ছিন্ন করে ফেলায় তাদের শারীরিক একধরনের অভিযোজন, যা প্রকৃতির সাথে ছিল তা নষ্ট হয়ে যায় এবং অনেকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পশুদের অভয়ারণ্য তৈরি করার জন্য প্রচুর মানুষকে এই প্রকার বিতাড়ন করা হয়েছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রকার জনবসতি হতে বিতাড়ন প্রক্রিয়া স্বীকৃত অর্থনৈতিক প্রপঞ্চ। কিন্তু অবশ্যই তার পূর্বে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সরকারি তরফ হতে নিশ্চিত করে নিতে হবে। কিন্তু সরকারি তরফ হতে পুনর্বাসনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় এই জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন বিতাড়িত এবং পরিত্যক্ত গন্তব্যহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, শরণার্থী কোনোভাবে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার উৎপাদন নয়।

shikhaprotidin

I have a Master's degree in Sociology from the National University and I run my sociology and education platform Shikhaprotidin.com to help students.

নবীনতর পূর্বতন